২৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ভুগছে শিক্ষার্থীরা, প্রশ্নের মুখে নীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ২৬-১০-২০২৬
ভুগছে শিক্ষার্থীরা, প্রশ্নের মুখে নীতি ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার নীতি, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে একাধিক শিক্ষা কমিশন ও কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসেছে নতুন শিক্ষাক্রম। আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আগের উদ্যোগের অনেক কিছুই বাদ পড়েছে বা সংশোধিত হয়েছে। এতে শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, শিক্ষকদের প্রস্তুতি এবং অভিভাবকদের প্রত্যাশা।

এবারও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিভিন্ন বক্তব্যে এ বিষয়ে আভাস দিয়েছেন। মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভর্তি প্রক্রিয়া এবং এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট কাঠামোগত প্রস্তুতির তথ্য সামনে আসেনি। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজন গবেষণা, অংশীজনদের মতামত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন সময়ে কমিশন ও কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঠ্যক্রম, পাঠ্যপুস্তক ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য সংশোধন। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল সময়ের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নতুন উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগেই নীতিগত পরিবর্তন এসেছে।

১৯৭২ সালে গঠিত হয় কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন। স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামো নির্ধারণে কমিশনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর ১৯৭৫ সালে অধ্যাপক সামছুল হুদা কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৮৩ সালে আসে মজিদ খান কমিশন। ১৯৮৭ সালে গঠিত হয় মফিজউদ্দিন আহমদ কমিশন। পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক স্তরে ১৯৯২ সালে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম এবং ১৯৯৫ সালে মাধ্যমিক স্তরে উদ্দেশ্যভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১৯৯৭ সালে এম শামসুল হক কমিশন গঠন করা হয়। ২০০১ সালে আসে ড. এম এ বারী কমিটি। ২০০৩ সালে গঠিত হয় মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিয়া কমিশন। পরে ২০০৯ সালে কবির চৌধুরী কমিশন গঠন করা হয়। সর্বশেষ বড় ধরনের শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ধারায় ২০২১ সালে দক্ষতা ও অর্জনভিত্তিক পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করা হয়। এই শিক্ষাক্রম পর্যায়ক্রমে ২০২৩ সাল থেকে বাস্তবায়ন শুরু হয়।

তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের সেই ধারা বন্ধ হয়ে যায়। আগের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনেও পরিবর্তন আসে। ফলে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

শিক্ষানীতি পরিবর্তন বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই হয়ে থাকে। সময়ের চাহিদা, প্রযুক্তির অগ্রগতি, শ্রমবাজারের পরিবর্তন এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনেই সাধারণত এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনা জড়িয়ে পড়ে এবং আগের উদ্যোগের মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগেই নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়।

শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয়বস্তু যেমন বদলায়, তেমনি বদলে যেতে পারে পরীক্ষার ধরন, নম্বর বণ্টন এবং শেখার পদ্ধতি। এক ব্যবস্থায় পড়াশোনা শুরু করে অন্য ব্যবস্থায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের মানিয়ে নিতে বাড়তি চাপ সামলাতে হয়। শিক্ষকদেরও নতুন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। অভিভাবকদের জন্যও সন্তানের পড়াশোনার পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিক্ষার্থীদের আর কত দিন রাজনৈতিক বিরোধ ও সিদ্ধান্তের প্রভাবের মধ্যে থেকে পরীক্ষামূলক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, সেই প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষা খাতে পরিবর্তন অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নতুন পদ্ধতি চালুর আগে তার কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। একইভাবে পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও দেখতে হবে, পরিবর্তনটি শিক্ষার্থীদের শেখার মান কতটা উন্নত করবে। শুধু সরকার পরিবর্তনের কারণে একটি শিক্ষাব্যবস্থার কার্যক্রম বন্ধ বা পুনর্বিন্যাস করা হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর মনে করেন, যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম তৈরি ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তককে একই বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ শিক্ষাক্রম হলো শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কীভাবে শিখবে এবং তাদের শেখার অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তার সামগ্রিক পরিকল্পনা। অন্যদিকে পাঠ্যপুস্তক সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি উপকরণ।

অধ্যাপক তারিক মনজুরের মতে, ২০২৩ সালে চালু হওয়া নতুন শিক্ষাক্রমটি সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আধুনিক উদ্যোগ ছিল। তবে এ নিয়ে যেসব আপত্তি উঠেছিল, তার বড় অংশ ছিল পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু নিয়ে। ফলে শিক্ষাক্রমের মূল ধারণা এবং পাঠ্যবইয়ের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্ক অনেক সময় একাকার হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বইয়ের নির্দিষ্ট অধ্যায়, উদাহরণ বা উপস্থাপন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা পর্যালোচনা করে সংশোধন করা সম্ভব। কিন্তু সে কারণে পুরো শিক্ষাক্রম বাতিল বা পরিবর্তন করার প্রয়োজন আছে কি না, তা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। শিক্ষাক্রমের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে পাঠ্যপুস্তক রচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক তারিক মনজুরের বক্তব্য অনুযায়ী, পাঠ্যবই লেখা ও সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থাকলেও অনেকের মধ্যে শিক্ষাক্রম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণার ঘাটতি দেখা যায়। ফলে নির্ধারিত শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য বইয়ে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সম্পাদনার কাজে যে সম্মানি দেওয়া হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়। এর ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কাজে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারেন না। শিক্ষাক্রমের মান উন্নত করতে হলে দক্ষ লেখক ও সম্পাদক নির্বাচন, পর্যাপ্ত সম্মানি এবং কাজের জন্য যথেষ্ট সময় নিশ্চিত করাও জরুরি।

বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তনের প্রবণতার বিপরীতে ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। আলোচ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সত্তরের দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশে বড় ধরনের শিক্ষাগত পরিবর্তন হয়েছে সাতবার। একই সময়ে ভারতে বড় পরিবর্তন এসেছে পাঁচবার। চীনেও এ সময়ে জাতীয় পর্যায়ে পাঁচটি বড় সংস্কার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চীনের ১৯৫০ সাল থেকে হিসাব করলে বড় ধরনের পরিবর্তনের সংখ্যা আটটি, যার পাঁচটি হয়েছে সত্তরের দশকের পর থেকে। ভারতে বড় ধরনের শিক্ষাগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শিক্ষা কমিশন গঠন এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এতে নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে চীনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২২-২৩ সময়কালে ভারত ও চীন উভয় দেশেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের দক্ষতার চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ দেখা যায়। এর মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের জন্য প্রস্তুত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির উপযোগী দক্ষতা তৈরি করা।

তবে দেশগুলোর সংস্কারের সংখ্যা তুলনা করলেই শিক্ষাব্যবস্থার মান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কোন পরিবর্তন কী উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে, কতটা কার্যকর হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর তার প্রভাব কী—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গবেষণাভিত্তিক পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিনল্যান্ডের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল পর্যায়ে কয়েকবার বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ পরিচালিত হয় অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। ফেডারেল সরকার অর্থায়ন, নীতিগত নির্দেশনা এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তদারকির দায়িত্ব পালন করে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিকেন্দ্রীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ফিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য আলোচিত। দেশটিতে ১৯৫০-এর দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে ছয়টি বড় পদ্ধতিগত পরিবর্তন এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পরিবর্তন ছিল শিক্ষাপ্রশাসনকেন্দ্রিক। এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো, পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।

এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘ সময় একই শিক্ষানীতি অপরিবর্তিত রাখা কোনো সমাধান নয়। বরং সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনতে হয়। তবে পরিবর্তনটি হতে হবে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক। শিক্ষার্থীদের শেখার মান, শিক্ষক প্রস্তুতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দেশের অর্থনৈতিক চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে সংস্কার করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলালেও শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বিস্তারের কারণে কর্মক্ষেত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করানো যথেষ্ট নয়। তাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশে এখনো শিক্ষা ও মূল্যায়নের বড় অংশ পাঠ্যবইকেন্দ্রিক। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান বা কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে কতটা সক্ষম হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীরা যা শিখছে, তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারছে কি না, সেটি যাচাই করা।

এ জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং উপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োজন। শুধু পাঠ্যবই বদলে বা নতুন নিয়ম ঘোষণা করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। নতুন পদ্ধতি চালুর আগে শিক্ষকদের প্রস্তুত করতে হবে। পাশাপাশি শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন পদ্ধতির প্রভাব বুঝতে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ও নিয়মিত মূল্যায়নও জরুরি। কোনো পদ্ধতিতে দুর্বলতা পাওয়া গেলে তা সংশোধন করতে হবে। আবার কার্যকর কোনো উদ্যোগ রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে পরিত্যক্ত না করে তার সুফল ধরে রাখার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। শিক্ষাক্রম তৈরির সময় বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি শিক্ষা গবেষক ও শ্রেণিকক্ষে কাজ করা শিক্ষকদের মতামত নিতে হবে। পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ